29 C
Dhaka
Sunday, June 16, 2024

‘ইয়াবা ডিলার’ মনিকা হতে চান মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান

‘মনিকা আক্তার নিজ বাড়িতে যুবক-যুবতীদের এনে ইয়াবা সেবন করায় ও অনৈতিক কাজে সহায়তা করে থাকে। তাছাড়া সে নিজেও খদ্দের এনে অনৈতিক কাজ করে থাকে। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ইয়াবা-ফেনসিডিলের কারবার পরিচালনা করে থাকে।’

বর্তমানে ঢাকা জেলা উত্তর যুব মহিলা লীগের সিনিয়র সহসভাপতির দায়িত্বে থাকা মনিকা আক্তারকে নিয়ে ২০১৭ সালে হটলাইনে পাওয়া অভিযোগের তদন্ত করে সে বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর এমন প্রতিবেদন দিয়েছিল মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। প্রতিবেদনের মন্তব্যে মনিকা আক্তার ‘ইয়াবার ডিলার’ বলে জানানো হয়।

ওই ঘটনার সময় তিনি ছিলেন আশুলিয়া থানা যুব মহিলা লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক। অভিযোগ ওঠার পর তাকে বহিষ্কার করা হয়। বর্তমানে তিনি ঢাকা জেলা উত্তর যুব মহিলা লীগের সিনিয়র সহসভাপতি।

দ্বিতীয় ধাপে ২১ মে হতে যাওয়া উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে মনিকা আক্তার ঢাকার সাভার উপজেলায় মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হিসেবে কলস প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

মাদকদ্রব্য অধিদপ্তরের অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, আশুলিয়া থানা যুব মহিলা লীগের বহিষ্কৃত নেত্রী মনিকা আক্তার ও তার পরিবারের পাঁচ সদস্য মাদক এবং দেহব্যবসার সঙ্গে জড়িত। এমনকি মনিকা তার নিজ বাড়িতেই এসব অনৈতিক কাজ পরিচালনা করেন।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়, ‘মনিকা আক্তার ইয়াবার ডিলার। তার দুলাভাই আফজাল হোসেন এবং মামাতো ভাই জাহিদ ইয়াবা ও ফেন্সিডিল ব্যবসায়ী। এ ছাড়া মনিকার বড় খালা আয়শা বেগম, খালু রনি ও খালাতো বোন নার্গিস ইয়াবা ব্যবসায়ী।’

এ ছাড়া মনিকার মামা কাজল মিয়া, মামি নাজমুন নাহার, খালু শহীদ ভূইয়া, বোনজামাই জসিম উদ্দিন ও খালাতো ভাই রাজু মিয়ার নামেও আশুলিয়া থানায় ছিল আরও চারটি মাদক মামলা।

আরো পড়ুন  লঞ্চে সন্তান প্রসব, মা-নবজাতকের আজীবন ভাড়া ফ্রি

মনিকা আক্তার মাদকদ্রব্য অধিদপ্তরের তালিকাভুক্ত মাদক ব্যবসায়ী চিহ্নিত হওয়ার পর নিজেকে নির্দোষ দাবি করে তার এলাকার ধামসোনা ইউনিয়নের ৭নং ওয়ার্ডের মেম্বার মঈনুল ইসলামের কাছে প্রত্যয়নপত্র চান। এতে রাজি না হওয়ায় ওই ইউপি সদস্যের বিরুদ্ধে নানা অপপ্রচার চালাতে থাকেন মনিকা। পরে ওই ইউপি সদস্য মনিকার বিরুদ্ধে থানায় একটি লিখিত অভিযোগ করেন।

অপপ্রচার, হয়রানি ও হুমকি প্রদানের অভিযোগে মনিকার বিরুদ্ধে থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছেন আশুলিয়া থানা যুব মহিলা লীগের সভাপতি নাজমুন নাহার কাজল ও সাধারণ সম্পাদক সাবিনা আক্তার লাভলী। তিন লাখ টাকা চাঁদা না পেয়ে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা, মারধর ও ভাঙচুরের অভিযোগে বহিষ্কৃত যুবলীগ নেত্রী মনিকার বিরুদ্ধে ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে একটি মামলা চলমান।

২০২০ সালের ৭ মার্চ ডিশ ব্যবসা দখল নিতে গিয়ে গণপিটুনির শিকার হন মনিকা আক্তার। পুলিশ ও স্থানীয়রা জানায়, চাড়াল পাড়া এলাকায় ডিশ ব্যবসা নিয়ে স্থানীয় ব্যবসায়ী সোহাগের সঙ্গে বিরোধ চলছিল মনিকার। ব্যবসা দখলের জন্য তিনি বিভিন্ন সময়ে ওই এলাকায় গিয়ে গ্রাহকের সংযোগ কেটে দেন। ওই দিন দুপুরে তিনি ফের ডিশ সংযোগ কাটতে গেলে স্থানীয়দের সঙ্গে বাগবিতণ্ডা শুরু হয়। একপর্যায়ে এলাকাবাসী জড়ো হয়ে তাকে গণপিটুনি দেয়। পরে তাকে উদ্ধার করে এনাম মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

দীর্ঘ দিন ধরেই রাজনৈতিক পরিচয়ে মাদক ও নারী ব্যবসা, চাঁদাবাজি, দখল ছাড়াও মিথ্যা নারী নির্যাতন মামলায় ফাঁসিয়ে ব্ল্যাকমেইলের বিস্তর কাণ্ডসহ নানা অপরাধে হাত পাকানো মনিকা আক্তার এবার আসন্ন ষষ্ঠ উপজেলা পরিষদের নির্বাচনে সাভার উপজেলা পরিষদের মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

আরো পড়ুন  রাজ‌মি‌স্ত্রির কাজ করে ছেলেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াচ্ছেন মমেজা বেগম

ঢাকা জেলা উত্তর যুব মহিলা লীগের সিনিয়র সহসভাপতি মনিকা আশুলিয়া থানা যুব মহিলা লীগের বহিষ্কৃত যুগ্ম আহ্বায়ক। তার ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে আশুলিয়া থানায় একাধিক মাদক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আশুলিয়া থানা যুব মহিলা লীগের সাবেক সভাপতি নাজমুন নাহার কাজল বলেন, যা হওয়ার হইছে। আমি এখন আর কিছু বলছি না। যা করার ও করছে। ও ক্ষতি করুক। এক দিন ও বুঝবে। তার বিষয়ে সবাই জানে।

তিনি আরও বলেন, মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে মনিকাকে বহিষ্কার করা হলে সে আমার বিরুদ্ধে নানা অপপ্রচার চালাতে থাকে। একপর্যায়ে আমার স্কুলপড়ুয়া ছেলেকে মিথ্যা নারী নির্যাতন মামলায় ফাঁসিয়ে কারাগারে পাঠায়।

আশুলিয়া থানা যুব মহিলা লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সাবিনা আক্তার লাভলী বলেন, পার্লারের ভেতরে ঢুকে ওরা আমাকে সরে দাঁড়াতে বলছিল। তখনই ওই হামলার ঘটনা ঘটে। ভাংচুর করে। মারধর করে। মনিকার হামলায় আমার মেয়ের পেটে থাকা ছয় মাসের বাচ্চা নষ্ট হয়ে যায়। আমি এখন বিচার আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিছি।

যা আছে নির্বাচনী হলফনামায়

নির্বাচনে দাখিল করা হলফনামায় মনিকা আক্তার নিজের নামে কোনো মামলা নেই বলে জানান। নিজের পেশা হিসেবে দেখিয়েছেন, মুরগির ব্যবসা। ব্যবসা থেকে ৪ লাখ ১০ হাজার টাকা আয় তার। জীবন বিমা আছে ৪ লাখ ২০ হাজার টাকার। নগদ টাকা আছে ১৬ লাখ ৪০ হাজার আর স্বামী কাছে আছে ৩ লাখ টাকা।

আরো পড়ুন  যুবলীগ নেতাকে প্রকাশ্যে কোপাল দুর্বৃত্তরা

ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে তার জমা করা অর্থের পরিমাণ ৪ লাখ ৭৮ হাজার টাকা। স্বামীর নামে আছে ২০ হাজার টাকা। ৭ শতাংশ জমির ওপর চার কক্ষের টিনশেড বাড়ি আছে তার। যার মূল্য ৭০ লাখ টাকা।

এসব বিষয়ে মনিকা আক্তার বলেন, অভিযোগ যে কেউ করতে পারে। রাজনৈতিক কারণে কেউ অভিযোগ করেছিল। সেটা সত্যতা পায়নি বিধায় অভিযোগ বাতিল হয়েছিল। আমি জানি না নির্বাচন করতে গেলেই কেন মানুষ এগুলা করে! ২০১৭ থেকে আপনাদের এমন প্রশ্নের জবাব দিয়েছি। আর কোনো মামলা নেই।

ঢাকা-১৯ (সাভার-আশুলিয়া) আসনের সংসদ সদস্য সাইফুল ইসলাম বলেন, আমি কাউকে সমর্থন দিচ্ছি না। দেওয়ার সুযোগ নেই। আমি তার পক্ষে কোথাও বলিনি। বিপক্ষেও বলিনি। সে মাদক ব্যবসায়ী এটা আমি কখনো শুনিনি। তার ব্যক্তিগত ঝামেলা ছিল অনেক আগে, ৩-৪ বছর আগে। ভোট দেওয়া না দেওয়া জনগণের বিষয়। আমি কারও পক্ষে ভোট চাই না। তার পরিবার মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত তা আমার জানা নেই।

ঢাকা জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) মো. আসাদুজ্জামান বলেন, নির্বাচন কমিশন অনেক সময় আমাদের কাছে চান। এগুলো রিটার্নিং কর্মকর্তা দেখেন। মামলা থাকলে সেটার যে আইনি প্রক্রিয়া সেটা চলমান। নির্বাচনকালীন যে বিষয়, এমন অভিযোগ থাকলে সেটা তারাই দেখেন। মামলার কপি পাঠায়েন। আমি দেখব।

সর্বশেষ সংবাদ