30 C
Dhaka
Friday, July 19, 2024

একের পর এক শিশু নিখোঁজের পোস্ট, আসলে কী ঘটছে?

বাড়ির পাশেই খেলাধুলা করছিল ৭ বছর বয়সি ‍মুকিব। কিন্তু হঠাৎ করে তাকে আর পাওয়া যাচ্ছিল না। সকাল থেকে দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে যায়; কিন্তু মুকিবকে আর খুঁজে পায় না বাবা-মা। সময় গড়ার সঙ্গে সঙ্গে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ঘিরে ধরে শিশুটির পরিবারকে। শেষে সন্ধ্যায় ঘরে ফেরে মুকিব। কিন্তু ফেসবুকে সে এখনো নিখোঁজ!

গত কয়েকদিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক একের পর এক ‘নিখোঁজ’ সংবাদে সয়লাব। বিশেষ করে শনিবার (৬ জুলাই) বিষয়টি দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়। বিভিন্ন গ্রুপ ও পেজ থেকে দেয়া শিশু কিংবা বিভিন্ন বয়সি ছেলে-মেয়ে নিখোঁজের পোস্টগুলো উদ্বেগ সৃষ্টি করে। অনেকে এসব পোস্ট শেয়ার করেন।

ফেসবুকে নিখোঁজের এসব পোস্ট দেখে কয়েকজনের সঙ্গে যোগাযোগ করে সময় সংবাদ। এতে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। উপরে উল্লিখিত মুকিবের মা মোছা. লাকি জানান, শুক্রবার সকালে বাইরে খেলছিল মুকিব। এ সময় প্রতিবেশী একটি ছেলে তাকে আদর করে পার্কে ঘুরতে নিয়ে যায়। কিন্তু বিষয়টি জানতেন না তারা। এ কারণে দীর্ঘ সময় এত কম বয়সি ছেলেকে খুঁজে না পেয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। বিকেল পাঁচটার দিকে প্রতিবেশী ওই ছেলেটিই মুকিবকে নিয়ে বাড়ি ফিরে আসে।

মোছা. লাকি বলেন,
এখানে ছেলেধরা বা অন্য কোনোকিছু নাই। ছেলেটি আমাদের পরিচিত। মুকিবকে ঘুরতে নেয়ার কথা ছেলেটি বলে যায়নি, তাই আমরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলাম।

শুক্রবার সন্ধ্যায় মুকিব ঘরে ফেরে; কিন্তু শনিবারও তার নিখোঁজের গুজব ছড়ানো হয় ফেসবুকে। ‘জাগো বোয়ালখালী-সময়ের সাথে, পরিবর্তনের পথে’ নামে একটি ফেসবুক গ্রুপে শনিবার রাত সাড়ে ১০টায় ওয়াহিদুল ইসলাম নামে একটি শিশুর ছবিসহ পোস্টে দাবি করা হয়, ‌সে বোয়ালখালীর (চট্টগ্রামে) ছেলে। অথচ মুকিবের বাড়ি বরিশালে এবং পুরো ঘটনাই বরিশালের।

আরো পড়ুন  স্ত্রীর মর্যাদা চান ছাত্রলীগ নেত্রী নেতা বলছেন—বিয়েই করিনি

নিখোঁজ সংক্রান্ত এ ধরনের পোস্ট বেশি দেখা গেছে চট্টগ্রামভিত্তিক বিভিন্ন গ্রুপে। গত ৮ জুন সকালে চট্টগ্রামের চান্দগাঁওয়ের একটি মাদ্রাসা থেকে নিখোঁজ হয় ৯ বছর বয়সি শাওয়াল শরীফ সাদমান। বিষয়টি জানাজানি হলে স্বজনরা বিভিন্ন ফেসবুক গ্রুপে পোস্ট করতে থাকেন। আরাফাত উদ্দিন নামে একজন ‘ডেসপারেটলি সিকিং চট্টগ্রাম’ নামের গ্রুপে পোস্ট করে শিশুটির সন্ধান চান। সেদিন রাতেই শিশুটিকে পাওয়া যায়। কিন্তু তার নিখোঁজের পোস্টগুলো এখনো ফেসবুকে ঘুরছে!

নিখোঁজ সংক্রান্ত আরেকটি ঘটনা ঘটে চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে। ‘হেল্পলাইন চট্টগ্রাম’ নামে ফেসবুক গ্রুপে মো. হামিদুল ইসলাম নামে একজন পোস্ট করে জানান, তার ছোট ভাই খাইরুল ইসলাম প্রকাশ রানাকে (২০) খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ছেলেটির কয়েকটি ছবি পোস্ট করে তিনি অনুরোধ করেন, তার সন্ধান পেলে হাটহাজারীর পশ্চিম মির্জাপুরের বাড়ির ঠিকানায় যোগাযোগ করতে।

রোববার (৭ জুন) বেলা পৌনে ১২টার দিকে নিখোঁজ রানার ভাই ওবায়দুল হক সময় সংবাদকে জানান, চার দিন নিখোঁজ থাকার পর কিছুক্ষণ আগে তার ভাইকে চট্টগ্রামের ২ নাম্বার গেইট এলাকায় খুঁজে পেয়েছেন। তবে নিখোঁজ অবস্থায় রানা কোথায় ছিলেন তা জানাতে পারেননি ওবায়দুল হক। তিনি বলেন, ‌‘আমার ভাই কথাবার্তা কম বলছে। এই মুহূর্তে সে ঘুমাচ্ছে। তার সঙ্গে কথা বলতে পারিনি। কথা বলে পরে জানাবো।’

চট্টগ্রামের হালিশহর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. কায়সার হামিদ আরেকটি ঘটনার বর্ননা দেন। বলেন ‘দুই দিন আগে আমার এলাকা থেকে রাহিনুল ইসলাম তাকি নামে ১৬ বছর বয়সী এক কিশোর নিখোঁজ হয়েছে বলে জিডি হয়। পরে আমরা রাহিনকে ঢাকা থেকে দুদিন পর পাই। বড় ভাই বকা দেয়ার কারণে সে ঢাকায় চলে গিয়েছিল। কোনো ছেলে ধরার ঘটনা না।’

আরো পড়ুন  কারাগারের গ্রিল কেটে নিয়ে গেল চোর

শিশু নিখোঁজের ভাইরাল পোস্টগুলো দেখে সময় সংবাদ যতগুলো জায়গায় খোঁজ নিয়েছে তার প্রায় সবগুলোই দেখা গেছে ভিত্তিহীন। যারা হারিয়ে গেছে বলে পোস্ট দেয়া হয়েছিল, পরে তাদের অনেককেই খুঁজে পাওয়া গেছে। কিন্তু তাদের সন্ধান মেলার খবর অনেক ক্ষেত্রেই জানানো হচ্ছে না, বা পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হলেও পুরোনো পোস্টগুলোই মানুষ শেয়ার করছেন। ফলে একটা ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হচ্ছে।

‘হেল্প ইন চট্টগ্রাম’ নামে একটি গ্রুপে পোস্ট করে এ জে আব্দুল্লাহ নামে একজন লেখেন, তার ফ্রেন্ডের ১৪ বছর বয়সী বোনকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। সি ডি ডি এল স্কুল থেকে বের হয়ে আর বাসায় ফেরেনি। তার পরনে ছিল স্কুলড্রেস। পোস্টটি মুহূর্তেই ভাইরাল হয়। গ্রুপটিতে মাহেরোজ মুহারিব আফফান নামের আরেকজন পোস্ট করেন, নিজ বাসা থেকে স্কুলে যাওয়ার সময় নিখোঁজ হয় পটিয়ার ১৭ বছর বয়সী একটি ছেলে।

চট্টগ্রাম গ্রুপ নামে একটি পেজে মো. নওশাদ নামে একজন পোস্ট দেন, ‘গত ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ঢাকাসহ চট্টগ্রামে ৪৮ বাচ্চা নিখোঁজ।’ চিটাগাং ইউনিভার্সিটি নিউজ নামে একটি পেজ থেকে পোস্ট দেয়া হয়, ‘গত ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ঢাকাসহ চট্টগ্রামে ৩৫ বাচ্চা নিখোঁজ।’ চট্টগ্রাম গ্রুপ নামের পেজে মো. উসামা নামে একজন লিখেন, ‘গত এক সপ্তাহে দেশে ১৫০ এর অধিক মাদ্রাসার ছাত্র-ছাত্রী নিখোঁজ।’

রোববারও অনেকে ফেসবুকে এই ধরনের পোস্ট দেন। ‘একাকিত্ব’ নামে একটি পেজে লেখা হয়, ‘লাস্ট ৭২ ঘণ্টায় ঢাকাসহ বিভিন্ন জায়গার ৫০+ শিশু নিখোঁজ। সারাদেশে এগুলো কি শুরু হলো হঠাৎ!! ছেলে ধরার মতো কোনো একটা সক্রিয় চক্র মাঠে নেমেছে। সবাই সাবধান হোন।’ নিউজটি দ্রুত শেয়ার করে সবাইকে এলার্ট করে দেয়ার আহ্বানও জানানো হয় পোস্টে।

আরো পড়ুন  রাতে চবির মূল ফটকে তালা দিয়ে শিক্ষার্থীদের মুঠোফোন তল্লাশি, মারধর

এমন নিখোঁজের খবরের প্রভাবও দেখা যাচ্ছে জনমনে। অনেকে আতঙ্কিত হয়ে ফেসবুকে পোস্ট করছেন। নাজমা হক নামের এক নারী লিখেছেন, ‘হঠাৎ ছেলে-মেয়ে হারানোর পরিমাণ বেড়ে গেছে মনে হচ্ছে। বিষয়টি শঙ্কার। সবাইকে সাবধানে থাকার অনুরোধ করছি।’

তবে এসব গুজবের বিরুদ্ধেও ফেসবুকে পোস্ট দিচ্ছেন অনেকে। সাইদুজ্জামান অন্তর নামের একটি পেজে লেখা হয়েছে, ‘ফেসবুকে আপনারা অনেকেই নিখোঁজ বিজ্ঞপ্তির পোস্ট শেয়ার করছেন। যেগুলো শেয়ার করছেন তাদের কয়েকজন ছাড়া বাকি সবাইকে পাওয়া গেছে। নতুন করে দেখা যাচ্ছে অনেকে গ্রুপ বা পেজে শেয়ার করছে, ঢাকা ও চট্টগ্রামে ৩৫ নাকি কতজন নিখোঁজ, এটা পুরাই ভিত্তিহীন। অহেতুক গুজব ও বিভ্রান্তি ছড়াবেন না। এটা কিন্তু সাইবার ক্রাইম। অনেকে সত্যটা না জেনে এরকম পোস্ট করে জনমনে ভীতি সৃষ্টি করছেন। সবাই এসব পোস্ট রিমুভ করুন।’

পুলিশও বলছে, একের পর এক শিশু নিখোঁজের এসব খবর আসলে গুজব। চট্টগ্রামের কোতোয়ালি জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার অতনু চক্রবর্তী বলেন,
শিশু নিখোঁজের বহু পোস্ট আমাদের চোখে পড়েছে। তবে বিষয়টি গুজব মনে হচ্ছে। কারণ, এত শিশু নিখোঁজ হলে থানায় নিশ্চয় অভিযোগ আসতো।

এ বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম এন্ড অপারেশন) ড. খ. মহিদ উদ্দিন বলেন, ‌‘শিশু নিখোঁজের কোনো তথ্য নেই। প্রতি মাসে স্বাভাবিক নিখোঁজ থাকে, তবে চোখে পড়ার মত না। এটি গুজবও হতে পারে। কারা গুজব ছড়াচ্ছে তা খতিয়ে দেখা হবে।’

না জেনে কোনো কিছু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করা থেকে বিরত থাকারও আহ্বান জানান পুলিশ কর্মকর্তারা।

সর্বশেষ সংবাদ