29 C
Dhaka
Sunday, June 16, 2024

মূল্যস্ফীতির চাপে সঞ্চয় ভেঙে খাচ্ছে মানুষ

দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতির ধারাবাহিক চাপে দিশেহারা সাধারণ মানুষ। বিশেষ করে স্বল্প আয়ের মানুষের ভোগান্তি আরও বেশি। বাজারে গিয়ে আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলাতে পারছেন না তারা। জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে তাই এতদিনের জমানো সঞ্চয় ভেঙে ফেলছেন অনেকেই। এ কারণে নতুন সঞ্চয়ের প্রবণতাও কমে গেছে। এর প্রভাব পড়ছে সরকারি সঞ্চয়পত্রের লেনদেনে। নতুন কেনার চেয়ে বেড়ে গেছে ভাঙানোর প্রবণতা।

একসময় বাংলাদেশ ব্যাংকে সঞ্চয়পত্র কেনার দীর্ঘ লাইন দেখা গেলেও বর্তমানে তা আর নেই। এর পরিবর্তে সঞ্চয়পত্র ভাঙানোর জন্যই বেশি মানুষ আসে। গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংকে গিয়ে দেখা যায়, কেউ কেউ মেয়াদপূর্তির আগেই সঞ্চয়পত্র ভাঙাতে এসেছেন। আবার কেউ কেউ এসেছেন মেয়াদপূর্তির পরে ভাঙাতে। আর কেউ এসেছেন সঞ্চয়পত্রের মাসিক বা ত্রৈমাসিক সুদ নিতে।

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ইয়াসমিন বেগম কালবেলাকে বলেন, ‘আমার স্বামী বেঁচে নেই। তার পেনশনের পুরো টাকা সঞ্চয়পত্র করে রেখেছিলাম। তা দিয়েই চার ছেলেমেয়ে নিয়ে সংসার চলছিল; কিন্তু এখন আর তা দিয়ে সংসার চলে না। কারণ বর্তমানে সব জিনিসের দামই অনেক বেশি। তাই সঞ্চয়পত্র ভাঙানোর বিষয়ে জানতে এসেছি। কিন্তু মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে ভাঙাতে গেলে অনেক কম টাকা পাওয়া যাবে বলে জানিয়েছে ব্যাংক।’ তার মতো অবস্থা অধিকাংশ মধ্যবিত্ত ও স্বল্প আয়ের মানুষের। তারা নতুন করে সঞ্চয় করার পরিবর্তে আগে করা সঞ্চয় ভেঙে খাচ্ছেন। সঞ্চয় ভেঙে সংসার খরচ সামলাতে হচ্ছে বলে সঞ্চয়ের স্থিতি কমে যাচ্ছে। এমনি করে নতুন সঞ্চয়ের গতিও কমে যাচ্ছে। ফলে ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোতে সঞ্চয়ের স্থিতিও কমেছে।

আরো পড়ুন  ঘূর্ণিঝড় রেমাল: ১০ নম্বর মহাবিপদ সংকেত

অব্যাহতভাবে সঞ্চয়পত্র ভেঙে ফেলায় চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে (জুলাই-মার্চ) নিট বিক্রির পরিমাণও ঋণাত্মক হয়ে গেছে। অর্থাৎ এই সময়ে নতুন সঞ্চয়পত্র বিক্রির চেয়ে আগে কেনা সঞ্চয়পত্রের মূল্য পরিশোধ বেশি হয়েছে। প্রতি মাসেই সঞ্চয়পত্র কেনার চেয়ে ভাঙানোর প্রবণতা বেশি লক্ষ করা যাচ্ছে। এতে প্রতি মাসেই নিট বিক্রি ঋণাত্মক হয়ে পড়ছে।

জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের হালনাগাদ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, সর্বশেষ মার্চ মাসে নিট বিক্রি ঋণাত্মক হয়েছে ৩ হাজার ৬৫৩ কোটি টাকা। আর চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে (জুলাই-মার্চ) নিট বিক্রি ঋণাত্মকের পরিমাণ ১২ হাজার ৫৪৫ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। গত অর্থবছরের একই সময়েও নিট বিক্রি ঋণাত্মক ধারায় ছিল। তবে ওই সময় এর পরিমাণ ছিল ৪ হাজার ১৬১ কোটি টাকা।

যদিও চলতি অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের নিট ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৮ হাজার কোটি টাকা। গত অর্থবছরের সঞ্চয়পত্র বিক্রি থেকে নিট ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় ৩৫ হাজার কোটি টাকা। তবে বিক্রি কমতে থাকায় সংশোধিত বাজেটে এ লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে ধরা হয় ৩২ হাজার কোটি টাকা। অর্থবছর শেষে নিট বিক্রি দাঁড়ায় ঋণাত্মক প্রায় ৩ হাজার ২৯৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ গত অর্থবছরের পুরো সময়ে সঞ্চয়পত্রের মোট বিক্রি হয় ৮০ হাজার ৮৫৮ কোটি টাকা। একই সময়ে সঞ্চয়পত্র ভাঙানোর পরিমাণ ছিল ৮৪ হাজার ১৫৩ কোটি টাকা। এর মানে, পুরো অর্থবছরে এ খাত থেকে সরকার এক টাকারও ঋণ নেয়নি। এ বিষয়টিকে মাথায় রেখে আগামী ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটে সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা আরও কমানো হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

আরো পড়ুন  রোহিঙ্গাদের ভরণপোষণে ঋণের পথে বাংলাদেশ

আগে বিক্রি হওয়া সঞ্চয়পত্র থেকে ভাঙানো বাবদ (নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষে বা মেয়াদান্তের আগে) আসল পরিশোধের পর যা অবশিষ্ট থাকে, তাকে নিট বিক্রি বলা হয়। নিট বিক্রিকে সরকারের ধার বা ঋণ হিসেবে গণ্য করা হয়। ২০২১-২২ অর্থবছরেও সঞ্চয়পত্র থেকে তুলনামূলক কম ঋণ পেয়েছিল সরকার। পুরো অর্থবছরে ৩২ হাজার কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে নিট ঋণ আসে ১৯ হাজার ৯১৫ কোটি টাকা। অথচ করোনার পরও ২০২০-২১ অর্থবছরে সঞ্চয়পত্রের নিট বিনিয়োগ হয়েছিল প্রায় ৪২ হাজার কোটি টাকা। এটি তার আগের অর্থবছরে ছিল মাত্র ১৪ হাজার ৪২৮ কোটি টাকা।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে সাধারণ মানুষ নতুন করে সঞ্চয় করার পরিবর্তে আগে করা সঞ্চয় ভেঙে খাচ্ছে। এ ছাড়া নানা কড়াকড়ি আরোপের কারণেও সঞ্চয়পত্র বিক্রিতে ধস নেমেছে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা এ বি এম মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম কালবেলাকে বলেন, ‘কড়াকড়ি আরোপ করার কারণেই মূলত সঞ্চয়পত্র বিক্রিতে ভাটা পড়েছে। এ ছাড়া উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষ খুব বেশি মুনাফা পাচ্ছে না। এটাও সঞ্চয়পত্র কমার বড় একটা কারণ। ঋণের বোঝা কমাতে সরকার সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নেওয়া কমিয়ে দিয়েছে। একই সঙ্গে টিআইএন এবং ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বাধ্যতামূলক করায় অনেকেই সঞ্চয়পত্রে আগের মতো বিনিয়োগ করতে পারছেন না। তার মতে, আগে কালো টাকাও সঞ্চয়পত্র খাতে বিনিয়োগ হতো। এখন সেটা হচ্ছে না। ফলে সঞ্চয়পত্র বিক্রিতে মন্দা দেখা দিয়েছে।’

আরো পড়ুন  ‘তুমি আমাকে আর পাবে না, আমি থেকে যাবো তোমার দীর্ঘনিশ্বাসে’

পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘এখন মানুষ আর সঞ্চয়পত্র কিনছে না। এর তিনটি কারণ রয়েছে- প্রথমত, ৫ লাখ টাকার উপরে সঞ্চয়পত্র কিনতে গেলে আয়কর রিটার্ন দিতে হচ্ছে; কিন্তু নানারকম ঝামেলার কারণে অনেকেই আয়কর রিটার্ন দিতে চান না। ফলে তারা এখান থেকে ধীরে ধীরে সরে আসছে। দ্বিতীয়ত, যাদের সঞ্চয়পত্র এক কোটি টাকার বেশি ছিল, সীমা নির্ধারণের কারণে এসব সঞ্চয়পত্রে মেয়াদ শেষে তারা আর নতুন করে কিনতে পারছেন না। তৃতীয়ত, মানুষের হাতে এখন টাকা কম আছে। বর্তমান মূল্যস্ফীতির চাপে মানুষ আর আগের মতো সঞ্চয় করতে পারছে না। এসব কারণে সঞ্চয়পত্র থেকে সরকার কম ঋণ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে অনেক বেশি ঋণ নিচ্ছে। যা আরও বেশি ক্ষতিকর। কেননা বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ঋণ নিলে তা সরাসরি মূল্যস্ফীতিতে প্রভাব ফেলে।’

দেশে বর্তমানে চার ধরনের সঞ্চয়পত্র রয়েছে। পাঁচ বছর মেয়াদি পরিবার সঞ্চয়পত্রের সুদহার ১১ দশমিক ৫২, পাঁচ বছরমেয়াদি পেনশনার সঞ্চয়পত্রের সুদহার ১১ দশমিক ৭৬, পাঁচ বছরমেয়াদি মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্রের সুদহার ১১ দশমিক ২৮ এবং তিন বছর মেয়াদি ও তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্রের সুদহার ১১ দশমিক ০৪ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের সব শাখা অফিস, বাণিজ্যিক ব্যাংকের নির্ধারিত শাখা, জাতীয় সঞ্চয় ব্যুরো অফিস ও পোস্ট অফিস থেকে সঞ্চয়পত্র কেনা যায়।

সর্বশেষ সংবাদ