29 C
Dhaka
Friday, July 19, 2024

ডাক্তাররা অফিস করেন না, ভূতে করে স্বাক্ষর!

পিরোজপুর প্রতিনিধি

বরিশালের উজিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার ডা. সঞ্জয় হালদার। স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ মিডফোর্ড হাসপাতাল থেকে মাস দুয়েক আগে বদলি হয়ে তিনি এখানে আসেন। যোগদানের পর থেকে তিনি হাতেগোনা কয়েকদিন অফিস করেছেন। বেশিরভাগ সময় থাকেন ঢাকায়। কিন্তু উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের হাজিরা খাতায় উপস্থিতির তালিকায় তার নাম রয়েছে নিয়মিত। ভূতুড়ে এ স্বাক্ষর কেবল ডা. সঞ্জয় হালদারেরই নয়, বেশিরভাগ ডাক্তারের ক্ষেত্রেই এমনটা হচ্ছে। যদিও সরকারি অফিসগুলোয় চালু রয়েছে ডিজিটাল হাজিরা। কিন্তু অদৃশ্য কারণে সেখানে এখনো সঞ্জয় হালদারদের নাম ওঠেনি।

উজিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের হাজিরা খাতার তথ্যানুসারে, ঈদের ছুটিকালীন তিন দিন অফিস করেছেন সঞ্জয় হালদার। একই তথ্য দিয়েছেন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. শওকত আলী। কিন্তু কালবেলার হাতে থাকা তথ্যপ্রমাণ বলছে, ঈদের ছুটিকালীন ১৭ জুন অফিস করেছেন সঞ্জয়।

এরপর ১৮ থেকে ২৩ তারিখ পর্যন্ত ছিলেন ঢাকায়। ১৮ তারিখে তিনি ঢাকার কেরানীগঞ্জ, ধানমন্ডিসহ বিভিন্ন জায়গায় অবস্থান করেছেন। ১৯ তারিখেও তার অবস্থান দেখা গেছে ঢাকার বিভিন্ন স্থানে। একইভাবে ৪ জুলাই উপস্থিতির খাতায় স্বাক্ষর রয়েছে এই কর্মকর্তার। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাও বলছেন সঞ্জয় অফিস করেছেন। কিন্তু কালবেলার তথ্যপ্রমাণ বলছে, ওইদিন সকাল ১০টার দিকে তিনি ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেন। দুপুর নাগাদ পৌঁছান ঢাকায়। এরপর ঢাকার ধানমন্ডিতে অবস্থান করেন। কেবল এ কয়েকদিনই নয়, হাজিরা খাতায় এমন ভূতুড়ে স্বাক্ষর রয়েছে অনেক।

আরো পড়ুন  ‘সেইভ বিডি’ মোমবাতি প্রজ্বলন করে সুফিয়া কামাল হলের শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. শওকত আলী। আরএমও হিসেবে রয়েছেন ডা. রাখাল বিশ্বাস। কনসালট্যান্ট পদ ৯টি। আছেন পাঁচজন। গত রোববার দুপুর ১২টা পর্যন্ত ইএনটির কনসালট্যান্ট ডা. সব্যসাচী কর্মস্থলে থাকলেও এরপর চলে যান তিনি। শিশু কনসালট্যান্ট কর্মস্থলে আছেন দাবি করলেও তাকে তার কক্ষে পাওয়া যায়নি। মেডিকেল অফিসার ১৪টি পদ, কর্মরত মোট ৮ জন। একজন ড. সাফিয়া মাতৃত্বকালীন ছুটিতে আছেন। একজন ডা. আসিফ আল মুকিত প্রেষণে শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করেন। বহির্বিভাগ ও আন্তঃবিভাগে দিনে চারজন এবং বিকেলে ও রাতে আন্তঃবিভাগের একজন করে দায়িত্ব পালন করেন। তবে দায়িত্বপ্রাপ্ত ইমারজেন্সি মেডিকেল অফিসার ডা. রাকিবকে জরুরি বিভাগে পাওয়া যায়নি। তিনি মেডিসিন বহির্বিভাগে রোগী দেখছিলেন। গাইনি বহির্বিভাগে একজন নারী চিকিৎসক রোগী দেখেন। চিকিৎসকের রুমের সামনে ১০ চিকিৎসকের নেম প্লেট আছে; কিন্তু ছিলেন মাত্র দুজন। এর মধ্যে রায়হান আহমেদ নামের একজন বদলি হয়ে শেবাচিম হাসপাতালে যোগদান করেছেন।

জানতে চাইলে ডা. সঞ্জয় হালদার দাবি করেন, তিনি নিয়ম মেনেই অফিস করেন। প্রয়োজনে ছুটি নিয়ে ঢাকায় আসেন। তিনি বলেন, আমার ফিঙ্গারে সমস্যা থাকায় ডিজিটাল হাজিরা দিতে পারিনি। এখন ঠিক হয়েছে।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে ডা. মো. শওকত আলী কালবেলাকে বলেন, সঞ্জয় নিয়মিত অফিস করছেন। তিনি অফিস ছেড়ে কোথাও যাননি। যদি গিয়ে থাকেন তবে সেটি অফিসের প্রয়োজনে যেতে পারেন। ডিজিটাল হাজিরার বিষয়ে জানতে চাইলে বলেন, তার ফিঙ্গারে সমস্যা ছিল। এজন্য লেট হয়েছে। গত রোববার থেকে তার ডিজিটাল হাজিরা শুরু হয়েছে।

আরো পড়ুন  মাটির নিচে পরিত্যক্ত অবস্থায় গ্রেনেডের সন্ধান

এদিকে রোববার ভান্ডারিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে দেখা যায়, ২৮ জন ডাক্তার থাকার কথা থাকলেও রয়েছেন ১৫ জন। তার মধ্যে তিনজন রয়েছেন ডেপুটেশনে। আউটডোরে রোগীদের সেবা দিচ্ছেন মাত্র দুজন ডাক্তার। অন্য রুমগুলো তালাবদ্ধ।

মেয়ে সাফাকে ডাক্তার দেখাতে আসা তানিয়া আক্তার জানান, সকাল ১০টায় এসেছি; এখন দুপুর সাড়ে ১২টা বাজে। কিন্তু ডাক্তার দেখাতে পরিনি। চরখালী গ্রামের নাসরিন আক্তার ও স্বপ্না জানান, রোগীদের দীর্ঘ লাইন, মাত্র দুজন ডাক্তার রোগী দেখছেন। কখন সিরিয়াল পাব, জানি না।

অভিযোগ রয়েছে, হাসপাতালটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য কর্মকর্তার ও প্রধান সহকারী কাম হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তার যোগসাজশে অনিয়ম ও দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে। তাদের শক্তিশালী সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি হাসপাতালের ডাক্তার ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এরা টেন্ডারবাজি, ঘুষ বাণিজ্য, একনায়কতন্ত্রসহ নানা অজুহাতে অর্থ আদায় করেন। এমনকি প্রধান সহকারী কাম হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা মো. আল মামুন প্রকাশ্যে বলেন, টাকা না দিলে কোনো কাজ হবে না। তার প্রকাশ্যে ঘুষ গ্রহণ নিয়ে কেউ প্রতিবাদ করলে তাদের বদলিসহ নানাভাবে হয়রানি করা হয়। এই সিন্ডিকেট আর্থিক সুবিধা নিয়ে হাসপাতালের এম এস আর টেন্ডার, খাবার ও মালপত্র ক্রয়ের ঠিকাদার নিয়োগ দেন।

আরো পড়ুন  ‘নগ্ন অবস্থায় নারীর সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রারের আপত্তিকর অঙ্গভঙ্গি’

স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সাতটি কেবিন ভাড়া দিলেও চারটির টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দিয়ে বাকি টাকা আত্মসাৎ করে আসছেন। এ ছাড়া আল মামুনের সহায়তায় গায়েবি বিল ভাউচারে লাখ লাখ টাকা উত্তোলন করে আত্মসাৎ করে আসছেন। দুর্নীতির টাকায় আল মামুন বরিশাল নির্বাচন অফিসের সামনে, ভান্ডারিয়া দক্ষিণ শিয়ালকাঠী ও রাজাপুরের বিভিন্ন জায়গায় কয়েক কোটি টাকার জমি ক্রয় করেছেন। এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, দুর্নীতি দমন কমিশনসহ (দুদক) বিভিন্ন দপ্তরে নার্স-কর্মচারীরা অভিযোগ জানালেও কোনো পদক্ষেপ নেয়নি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

জানতে চাইলে প্রধান সহকারী কাম হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা মো. আল মামুন বলেন, আমি এসবের সঙ্গে কোনোভাবেই সম্পৃক্ত নই। আমাকে হেয় করার জন্য কিছু লোক ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে।

ভান্ডারিয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. বর্ণালী দেবনাথ বলেন, এসব বিষয়ে আমার কাছে কোনো অভিযোগ আসেনি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে যদি কোনো অভিযোগ দেয়, তাহলে বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হবে।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী ডা. সামন্ত লাল সেন কালবেলাকে বলেন, বরিশালে সিভিল সার্জন আছেন। এ বিষয়টা যদি তিনি জানেন এবং আমাকে চিঠি লেখে জানান তাহলে তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব।

সর্বশেষ সংবাদ